বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
বাগেরহাট সদর উপজেলার রাখালগাছি ইউনিয়নে দুই বিঘা জমির মাছের ঘের দখল করে প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের মাছ লুটের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় বসতঘর ভাঙচুর, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও পানির পাম্প নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৮০০টি টমেটো গাছের ফলন্ত টমেটো তুলে নেওয়া হয়েছে। লুট করা হয়েছে পেঁপে, বেগুন, ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন সবজি ও ফল। এ ছাড়া অসংখ্য ফলজ ও সবজির গাছ কেটে এবং নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ফলন্ত লাউগাছের আগা ও কয়েকটি গাছের গোড়াও কেটে ফেলা হয়েছে। এতে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের। সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে সদর উপজেলার বড়পাইকপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় লাভলী বেগম বাদী হয়ে বাগেরহাট সদর থানায় এজাহার দায়ের করেছেন। অভিযোগকারী লাভলী বেগম বলেন, আমার স্বামী ও মা জুলেখা বেগমের কেনা সূত্রে পাওয়া দুই বিঘা জমিতে মাছের ঘেরটি অবস্থিত। ঘেরের পূর্ব পাশে বেড়িবাঁধের ওপর বাঁশের খুঁটি ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি ঘরে স্বামী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে বসবাস করি ।ঘেরের মাছ ও জমির ফসল বিক্রির আয়েই চলে আমাদের ছোট্ট সংসার। কিন্তু এভাবে সন্ত্রাসীরা আমাদেরকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে। মাছ লুট করে ফসল নষ্ট করে দিয়ে গেছে গাছ কেটে দিয়ে গেছে । আমি তাদেরকে দিয়ে হাতজোড় করে পায়ে ধরতে বাকি শুধু যে ফল টমেটো নিয়ে যাও পেঁপে নিয়ে যাও কিন্তু কেটে রেখে যেও না ওদেরকে আমি সন্তানের মত মানুষ করেছি টমেটো গাছ লাউ গাছ পেঁপে গাছ ওরা তাও আমার কথা শুনে নাই। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সুজন শেখের নেতৃত্বে ১৮ থেকে ২০ জন ব্যক্তি মাছ ধরার জাল ও লাঠিসোঁটা ও দেশি ও অস্ত্র নিয়ে ঘেরে প্রবেশ করেন। তারা ঘের থেকে মাছ ধরে নিয়ে যায়। পরে সুজনের সহযোগী যোগীসহ কয়েকজন বসতঘরে ঢুকে আসবাবপত্র ও মালামাল তছনছ করেন। এ সময় খাটের বিছানার নিচে রাখা নগদ ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, ছয় আনা ওজনের এক জোড়া স্বর্ণের কানের দুল (আনুমানিক মূল্য ৮৫ হাজার টাকা) এবং আট আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন (আনুমানিক মূল্য ১ লাখ ১০ হাজার টাকা) নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
বাধা দিতে গেলে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সাদিয়া বলেন, অনেক লোকজন এসে প্রথমে গাছপালা ও সবজি থেকে ফলমূল তুলতে শুরু করে। পরে জাল টেনে মাছ ধরে এবং পেঁপে, ঢেঁড়স, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসল নিয়ে যায়। চার-পাঁচটি ভ্যানে বস্তাভর্তি করে এসব মালামাল নিয়ে গেছে। লাভলী বেগমের বড় মেয়ে রেশমা বলেন, খবর পেয়ে বাড়িতে এসে দেখি লোকজন জাল টেনে মাছ ধরছে এবং গাছের ফল ও সবজি বস্তায় ভরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি বাধা দিলেও কেউ কথা শোনেনি। উল্টো ভিডিও ধারণ করতে গেলে আমার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এরপর অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে। তিনি আরও বলেন, আমাদের জমিতে প্রায় ৮০০টি টমেটো গাছ ছিল। এসব গাছে থাকা সব টমেটো তুলে নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। এ ছাড়া পেঁপে, বেগুন, ঢেঁড়স ও লাউগাছের ফলও তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলজ গাছসহ অসংখ্য গাছ কেটে ও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ফলন্ত লাউগাছের আগা এবং কয়েকটি গাছের গোড়াও কেটে ফেলা হয়েছে। এমনকি মাছ ধরার জালও কেটে ফেলা হয়েছে। বারবার নিষেধ করেও তাদের থামানো যায়নি। কামরুল ইসলামের ছোট ছেলে আলামিন বলেন, আমি ঘটনাটি ভিডিও করছিলাম। এ সময় তারা আমাকে মারধর করে। একপর্যায়ে আমার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ধারণ করা সব ভিডিও মুছে দেয়। এরপর আমাকে সেখান থেকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। প্রাণের ভয়ে বাড়ি থেকে চলে গিয়ে লোকজনকে ডাকতে থাকি। জমির মালিক শেখ কামরুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালে গৌরম্ভার আদাঘাট এলাকার ওহাব মল্লিকের কাছ থেকে তিনি ১০০ শতক জমি কেনেন। এরপর থেকে প্রায় ১৩ বছর ধরে ওই জমিতে বসবাস, মাছ চাষ ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। জমি নিয়ে যাঁদের সঙ্গে বিরোধ, তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতের রায় পাওয়ার পর তাঁর জমিতে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, আমি বাড়িতে ছিলাম না। এসে দেখি, ঘেরের মাছ, পেঁপে, সবজি ও অন্যান্য মালামাল বস্তা ও ড্রামে ভরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। মাছ ও ফসলসহ সব মিলিয়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার ক্ষতি করেছে তারা। আমি ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান ও ক্ষতিপূরণ চাই। আত্মীয় মোঃ শাহরিয়ার হোসেন শাওন বলেন, জমি নিয়ে যাদের সঙ্গে বিরোধ, তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা রয়েছে। এক পক্ষ রায় পেয়েছে দাবি করলেও জমির মূল মালিকপক্ষ উচ্চ আদালতে গেছেন বলে তাদের জানানো হয়েছে। এ অবস্থায় জোর করে ঘেরের মাছ ও ফসল নিয়ে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই তাদের। তিনি আরও বলেন, ঘের থেকে পাঁচ থেকে ছয় মণ গলদা চিংড়ি, দুই থেকে আড়াই মণ সাদা মাছ, প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বস্তা টমেটোসহ বিভিন্ন ফল ও সবজি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রায় ৮০০টি টমেটো গাছের ফল তুলে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পেঁপে, বেগুন, ঢেঁড়স ও অন্যান্য গাছের ফল লুটের পাশাপাশি ঘর ভাঙচুর, পানির পাম্প ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অসংখ্য গাছ কেটে ও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এতে আমার ফুফা অসহায় হয়ে পড়েছেন। কারণ, এই জমির আয় থেকেই তাঁদের সংসার চলে। তারা খুব গরিব ও অসহায় মানুষ। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। স্থানীয় বাসিন্দা হাসিনা বেগম বলেন, অনেক লোক এসে ঘেরের মাছ, ফল ও সবজি তুলে নিয়ে যায়। মাছ ড্রামে ভরে আমার বাড়ির দরজার সামনে রাখা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে তারা ভ্যানে করে সেগুলো নিয়ে যায়। এজাহার সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় লাভলী বেগম বাদী হয়ে বাগেরহাট সদর থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৮ থেকে ২০ জনকে আসামি করে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এজাহারে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন—বড়পাইকপাড়া গ্রামের আছাদ শেখের ছেলে সুজন শেখ (৩৫), মৃত কাদের শেখের ছেলে আছাদ শেখ (৬৫), হাকিম জোমাদ্দারের ছেলে মিলন জোমাদ্দার (৪৫) ও সেলিম জোমাদ্দার (৪৮), সোহরবের ছেলে সোহেল (৩০) এবং মোস্তফার ছেলে হান্নান (২৫)। তাঁরা সবাই বাগেরহাট সদর উপজেলার ৯ নম্বর রাখালগাছি ইউনিয়নের বড়পাইকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। এ বিষয়ে বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ সামসুল আরেফিন বলেন, লাভলী বেগম নামের একজন থানায় এজাহার দায়ের করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পিসি কলেজে জাতীয় ছাত্রশক্তির উন্মুক্ত বইঘর উদ্বোধন
Reporter Name 








