Dhaka , Sunday, 1 November 2026
শিরোনাম :
বাগেরহাটে ইউনিয়ন বিএনপির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না          —–ডা. শফিকুর রহমান জায়গার সংকট, আগাছা-জঙ্গলে বেহাল বাগেরহাটের বড় কবরস্থান, দাফনেও ভোগান্তি বাগেরহাট পৌর যুবদলের আয়োজনে যুবদলের ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা ৩০ অক্টোবর থেকে দুবলার চরে শুঁটকি উৎসব, জীবিকার সন্ধানে সাগরে নামছেন হাজারো জেলে বাগেরহাটে নাগরিক ফোরামের ত্রৈমাসিক সভা ও কার্যক্রম মূল্যায়নর কর্মশালা অনুষ্ঠিত  ৩১ অক্টোবর ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ, বাগেরহাটে কাটাখালীতে পথসভা পল্টন ট্র্যাজেডিতে শহীদদের স্মরণে বাগেরহাটে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল বাগেরহাটে বাংলালিংক কর্মীকে কুপিয়ে লক্ষাধিক টাকা ছিনতাই যুবদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে বাগেরহাটে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও সমাবেশ

খাল থেকে তোলা কচুরিপানাই এখন জীবিকার ভরসা, বাগেরহাট থেকে বিদেশে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব পণ্যের কাঁচামাল

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : 06:34:15 pm, Sunday, 5 July 2026
  • 78 বার

নিজস্ব প্রতিবেদক।

একসময় খাল-বিল ও নদ-নালার অবাঞ্ছিত জলজ উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত কচুরিপানাই এখন বাগেরহাটের একটি পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। খাল থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও শুকিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে চলছে চার সদস্যের একটি পরিবারের সংসার। পরে সেই কচুরিপানা দিয়ে তৈরি হচ্ছে গার্ডেন পট, চিকেন বাস্কেট, ডগ বাস্কেট, জুতা, ফুলদানি, ফ্লোর ম্যাট, পাপোশ, টিস্যু বক্সসহ নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য। এসব পণ্যের একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।বাগেরহাট শহরের খানজাহান পল্লীর গোবদিয়া এলাকার ৮ নং ওয়ার্ডের লেকপাড়সংলগ্ন খাল থেকে প্রতিদিন কচুরিপানা সংগ্রহ করা হচ্ছে। খালটি পরিষ্কার হওয়ার পর আশপাশের অন্যান্য খাল ও জলাশয় থেকেও কচুরিপানা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

কচুরিপানা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত শ্রমিক ইমরান শেখ বলেন,প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আমরা দুজন শ্রমিক মিলে খাল থেকে কচুরিপানা তুলি। এ কাজের জন্য প্রতিদিন মোট ২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি পাই। আগে কচুরিপানাকে কেউ গুরুত্ব দিত না, এখন এটিই মানুষের আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। খালটি পরিষ্কার করা হচ্ছে যাতে এখানে মাছ চাষ করা যায়। পরে জানতে পারি, সুমি বেগম ও তার স্কবামী এই সব চুরিপানা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠান। সেখানে প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়।আরেক শ্রমিক নয়ন শেখ বলেন,পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। তাই এখন কচুরিপানা তোলার কাজ করি। আগে জানতাম না কচুরিপানার এত মূল্য আছে। এখন শুনছি, এটি দিয়ে নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি হয়, যা দেশ-বিদেশে বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ রবিউল ইসলাম বলেন, আগে কচুরিপানায় খাল ভরে থাকায় পানি চলাচল ব্যাহত হতো। এখন নিয়মিত কচুরিপানা তুলে নেওয়ায় খাল অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে। একই সঙ্গে এই আগাছা বিক্রি করে মানুষ আয় করছে। এমন উদ্যোগ আরও বাড়লে পরিবেশের পাশাপাশি এলাকার অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

উদ্যোক্তা সুমি বেগম বলেন,আমরা স্বামী-স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে চারজন মিলে এই কাজ করি। আগে না বুঝে পিরোজপুরে প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে কচুরিপানা বিক্রি করতাম। এখন ঢাকার গাজীপুরের একটি প্রতিষ্ঠান প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে কেনার কথা জানিয়েছে। এতে আমাদের আয় অনেক বাড়বে বলে আশা করছি। সংসারের খরচ চালাতে সবাই মিলে পরিশ্রম করছি। আমাদের নিজের কোনো বাড়ি নেই, সরকারি জায়গায় থাকি। অনেক কষ্টের মধ্যেও এই কাজকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।সুমির স্বামী আবদুল্লাহ শেখ বলেন, আগে আমার একটি ছোট দোকান ছিল। ব্যবসা ভালো না চলায় সেটি বন্ধ করে দিতে হয়। পরে ইউটিউবে কচুরিপানা দিয়ে কাঁচামাল তৈরির ভিডিও দেখে আগ্রহী হই। পরিচিত একজনের সহযোগিতায় প্রায় তিন মাস আগে এই কাজ শুরু করি। এখন পুরো পরিবার মিলে কাজ করছি। সরকারি সহযোগিতা ও বড় বাজার পেলে এই কাজ আরও সম্প্রসারণ করতে চাই। তাহলে অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।তারা জানান, কচুরিপানা সংগ্রহের পর নির্দিষ্ট নিয়মে কেটে রোদে ভালোভাবে শুকাতে হয়। শুকানোর সময় অবশ্যই উঁচু ও শুকনো স্থানে রাখতে হয়। নিচে চাপা পড়ে গেলে বা ঠিকমতো না শুকালে সেই কাঁচামাল আর বিক্রিযোগ্য থাকে না। নির্ধারিত দৈর্ঘ্য ও মান বজায় রেখেই প্রক্রিয়াজাত করতে হয়।

স্থানীয়দের মতে, একদিকে যেমন খাল-বিল পরিষ্কার হচ্ছে, অন্যদিকে অবহেলিত কচুরিপানাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও সরকারি সহায়তা পেলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হবে এবং বহু বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এ বিষয়ে বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর (ভারপ্রাপ্ত)উপব্যবস্থাপক মোঃ সোহাগ হোসেন বলেন,কচুরিপানাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির উদ্যোগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। একসময় যেটিকে জলাশয়ের জন্য সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, এখন সেটিই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। কচুরিপানা দিয়ে তৈরি গার্ডেন পট, বিভিন্ন ধরনের বাস্কেট, ফ্লোর ম্যাট, ফুলদানি, পাপোশসহ নানা হস্তশিল্প দেশ-বিদেশে চাহিদা তৈরি করছে।তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পণ্যের মান উন্নয়ন, বাজারজাতকরণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমে বিসিকের পক্ষ থেকে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে আরও মানুষ এই খাতে এগিয়ে এলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, জলাশয়ও পরিষ্কার থাকবে, পরিবেশ উপকৃত হবে এবং রপ্তানি আয়ের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। বর্তমানে কচুরিপানা শুধু একটি জলজ উদ্ভিদ নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও একটি সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

khan

জনপ্রিয় সংবাদ

বাগেরহাটে ইউনিয়ন বিএনপির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

খাল থেকে তোলা কচুরিপানাই এখন জীবিকার ভরসা, বাগেরহাট থেকে বিদেশে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব পণ্যের কাঁচামাল

আপডেট টাইম : 06:34:15 pm, Sunday, 5 July 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক।

একসময় খাল-বিল ও নদ-নালার অবাঞ্ছিত জলজ উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত কচুরিপানাই এখন বাগেরহাটের একটি পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। খাল থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও শুকিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে চলছে চার সদস্যের একটি পরিবারের সংসার। পরে সেই কচুরিপানা দিয়ে তৈরি হচ্ছে গার্ডেন পট, চিকেন বাস্কেট, ডগ বাস্কেট, জুতা, ফুলদানি, ফ্লোর ম্যাট, পাপোশ, টিস্যু বক্সসহ নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য। এসব পণ্যের একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।বাগেরহাট শহরের খানজাহান পল্লীর গোবদিয়া এলাকার ৮ নং ওয়ার্ডের লেকপাড়সংলগ্ন খাল থেকে প্রতিদিন কচুরিপানা সংগ্রহ করা হচ্ছে। খালটি পরিষ্কার হওয়ার পর আশপাশের অন্যান্য খাল ও জলাশয় থেকেও কচুরিপানা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

কচুরিপানা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত শ্রমিক ইমরান শেখ বলেন,প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আমরা দুজন শ্রমিক মিলে খাল থেকে কচুরিপানা তুলি। এ কাজের জন্য প্রতিদিন মোট ২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি পাই। আগে কচুরিপানাকে কেউ গুরুত্ব দিত না, এখন এটিই মানুষের আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। খালটি পরিষ্কার করা হচ্ছে যাতে এখানে মাছ চাষ করা যায়। পরে জানতে পারি, সুমি বেগম ও তার স্কবামী এই সব চুরিপানা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠান। সেখানে প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়।আরেক শ্রমিক নয়ন শেখ বলেন,পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। তাই এখন কচুরিপানা তোলার কাজ করি। আগে জানতাম না কচুরিপানার এত মূল্য আছে। এখন শুনছি, এটি দিয়ে নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি হয়, যা দেশ-বিদেশে বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ রবিউল ইসলাম বলেন, আগে কচুরিপানায় খাল ভরে থাকায় পানি চলাচল ব্যাহত হতো। এখন নিয়মিত কচুরিপানা তুলে নেওয়ায় খাল অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে। একই সঙ্গে এই আগাছা বিক্রি করে মানুষ আয় করছে। এমন উদ্যোগ আরও বাড়লে পরিবেশের পাশাপাশি এলাকার অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

উদ্যোক্তা সুমি বেগম বলেন,আমরা স্বামী-স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে চারজন মিলে এই কাজ করি। আগে না বুঝে পিরোজপুরে প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে কচুরিপানা বিক্রি করতাম। এখন ঢাকার গাজীপুরের একটি প্রতিষ্ঠান প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে কেনার কথা জানিয়েছে। এতে আমাদের আয় অনেক বাড়বে বলে আশা করছি। সংসারের খরচ চালাতে সবাই মিলে পরিশ্রম করছি। আমাদের নিজের কোনো বাড়ি নেই, সরকারি জায়গায় থাকি। অনেক কষ্টের মধ্যেও এই কাজকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।সুমির স্বামী আবদুল্লাহ শেখ বলেন, আগে আমার একটি ছোট দোকান ছিল। ব্যবসা ভালো না চলায় সেটি বন্ধ করে দিতে হয়। পরে ইউটিউবে কচুরিপানা দিয়ে কাঁচামাল তৈরির ভিডিও দেখে আগ্রহী হই। পরিচিত একজনের সহযোগিতায় প্রায় তিন মাস আগে এই কাজ শুরু করি। এখন পুরো পরিবার মিলে কাজ করছি। সরকারি সহযোগিতা ও বড় বাজার পেলে এই কাজ আরও সম্প্রসারণ করতে চাই। তাহলে অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।তারা জানান, কচুরিপানা সংগ্রহের পর নির্দিষ্ট নিয়মে কেটে রোদে ভালোভাবে শুকাতে হয়। শুকানোর সময় অবশ্যই উঁচু ও শুকনো স্থানে রাখতে হয়। নিচে চাপা পড়ে গেলে বা ঠিকমতো না শুকালে সেই কাঁচামাল আর বিক্রিযোগ্য থাকে না। নির্ধারিত দৈর্ঘ্য ও মান বজায় রেখেই প্রক্রিয়াজাত করতে হয়।

স্থানীয়দের মতে, একদিকে যেমন খাল-বিল পরিষ্কার হচ্ছে, অন্যদিকে অবহেলিত কচুরিপানাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও সরকারি সহায়তা পেলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হবে এবং বহু বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এ বিষয়ে বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর (ভারপ্রাপ্ত)উপব্যবস্থাপক মোঃ সোহাগ হোসেন বলেন,কচুরিপানাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির উদ্যোগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। একসময় যেটিকে জলাশয়ের জন্য সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, এখন সেটিই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। কচুরিপানা দিয়ে তৈরি গার্ডেন পট, বিভিন্ন ধরনের বাস্কেট, ফ্লোর ম্যাট, ফুলদানি, পাপোশসহ নানা হস্তশিল্প দেশ-বিদেশে চাহিদা তৈরি করছে।তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পণ্যের মান উন্নয়ন, বাজারজাতকরণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমে বিসিকের পক্ষ থেকে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে আরও মানুষ এই খাতে এগিয়ে এলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, জলাশয়ও পরিষ্কার থাকবে, পরিবেশ উপকৃত হবে এবং রপ্তানি আয়ের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। বর্তমানে কচুরিপানা শুধু একটি জলজ উদ্ভিদ নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও একটি সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।