Dhaka , Sunday, 13 September 2026
শিরোনাম :
রামপালের এক ইউনিট বন্ধ, উৎপাদন নেমেছে ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে তন্ত্র-মন্ত্র নয়, কৌশলেই ৩০ বছর ধরে সাপ ধরছেন শামছু কচুয়ায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে জয় ঢাকার টপ ছিনতাইকারী আলামীনকে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।। তিন শতাধিক বাস, হাজারো যাত্রী,বেহাল টার্মিনালে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি মহিলাদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বাগেরহাটে আলোচনা সভা বাগেরহাটে কিশোরীদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রশিক্ষণ, চেক ও চারা বিতরণ মাছ-সবজির স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা, এখন আলুর ভরসায় ধুঁকছে বাগেরহাটের প্রথম কোল্ড স্টোরেজ কাপড় পেঁচিয়ে ফুটবল খেলা, মাদ্রাসাছাত্রদের হাতে বল তুলে দিলেন এডিসি বাগেরহাটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা

বাবাকে হারিয়েও থামেনি জীবন—রাতে চাকরি, সকালে এইচএসসি পরীক্ষা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : 10:59:24 am, Wednesday, 22 July 2026
  • 31 বার

বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ

বাবাকে শেষ বিদায় জানিয়ে বিকেলে সম্পন্ন করেছেন দাফন। শোকের ভারে ন্যুব্জ পরিবারকে সময় দেওয়ারও সুযোগ মেলেনি। রাত নামতেই হাতে বই নিয়ে ছুটতে হয়েছে এটিএম বুথের রাতের ডিউটিতে। কারণ সংসারের দায়ও তার কাঁধে। আর ঠিক পরদিন সকালেই অংশ নিতে হচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায়। একদিকে বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদ ও ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনন্য এক জীবনসংগ্রামের গল্প লিখছেন বাগেরহাটের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইকন।

বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা সদ্য প্রয়াত ইসরাফিল দাড়িয়ার ছোট ছেলে ইকন। বাবাকে হারানোর গভীর শোক বুকে নিয়েই তাকে এখন সামলাতে হচ্ছে সংসারের দায়িত্ব, চাকরি এবং শিক্ষাজীবনের কঠিন লড়াই। পরিবার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন ৪৫ বছর বয়সী ইসরাফিল দাড়িয়া। সকাল ৬টার দিকে তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী এবং দুই ছেলে—ইমন ও ইকনকে রেখে গেছেন। জীবিকার তাগিদে ইসরাফিল মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালাতেন। জোহরের নামাজের পর মুনিগঞ্জ দোতলা জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তার মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, বড় ছেলে ইমন একসময় বাবার সঙ্গে মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকেই পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠেন ছোট ছেলে ইকন। ইকন চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তিনি বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের খরচ চালাতে বাগেরহাট শহরের রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের শিফটে খণ্ডকালীন চাকরি করেন।বাবার দাফন শেষে মঙ্গলবার রাতেই তিনি কর্মস্থলে ফিরে যান। রাত ১০টার দিকেও তাকে এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। চোখে বাবাকে হারানোর অশ্রু, হৃদয়ে গভীর শোক—তবু থেমে থাকেননি তিনি। কারণ পরদিন, ২২ জুলাই, তার এইচএসসি পরীক্ষার ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের পরীক্ষা। একদিকে প্রিয় বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে মানসিক ভারসাম্যহীন বড় ভাই, সংসারের দায়িত্ব এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম—সব মিলিয়ে ইকনের জীবন যেন কঠিন বাস্তবতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ খোন্দকার আছিফ উদ্দিন রাখী বলেন,ইকন আমাদের কলেজের ছাত্র।ইকনের জীবনের এই কঠিন মুহূর্ত আমাদের সবাইকে ব্যথিত করেছে। এত বড় ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও সে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও চাকরি চালিয়ে যাচ্ছে, যা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। কলেজের পক্ষ থেকে আমরা তার পাশে আছি। প্রয়োজনে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। আমরা তার প্রয়াত বাবার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং ইকনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।

ইকনের এই সংগ্রামের গল্প ইতোমধ্যে স্থানীয়দের আবেগাপ্লুত করেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দায়িত্ববোধ, পরিবারকে আগলে রাখার চেষ্টা এবং শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তি অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার হয়ে উঠেছে। স্থানীয়রা ইকন ও তার পরিবারের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

khan

জনপ্রিয় সংবাদ

রামপালের এক ইউনিট বন্ধ, উৎপাদন নেমেছে ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে

বাবাকে হারিয়েও থামেনি জীবন—রাতে চাকরি, সকালে এইচএসসি পরীক্ষা

আপডেট টাইম : 10:59:24 am, Wednesday, 22 July 2026

বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ

বাবাকে শেষ বিদায় জানিয়ে বিকেলে সম্পন্ন করেছেন দাফন। শোকের ভারে ন্যুব্জ পরিবারকে সময় দেওয়ারও সুযোগ মেলেনি। রাত নামতেই হাতে বই নিয়ে ছুটতে হয়েছে এটিএম বুথের রাতের ডিউটিতে। কারণ সংসারের দায়ও তার কাঁধে। আর ঠিক পরদিন সকালেই অংশ নিতে হচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায়। একদিকে বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদ ও ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনন্য এক জীবনসংগ্রামের গল্প লিখছেন বাগেরহাটের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইকন।

বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা সদ্য প্রয়াত ইসরাফিল দাড়িয়ার ছোট ছেলে ইকন। বাবাকে হারানোর গভীর শোক বুকে নিয়েই তাকে এখন সামলাতে হচ্ছে সংসারের দায়িত্ব, চাকরি এবং শিক্ষাজীবনের কঠিন লড়াই। পরিবার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন ৪৫ বছর বয়সী ইসরাফিল দাড়িয়া। সকাল ৬টার দিকে তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী এবং দুই ছেলে—ইমন ও ইকনকে রেখে গেছেন। জীবিকার তাগিদে ইসরাফিল মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালাতেন। জোহরের নামাজের পর মুনিগঞ্জ দোতলা জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তার মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, বড় ছেলে ইমন একসময় বাবার সঙ্গে মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকেই পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠেন ছোট ছেলে ইকন। ইকন চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তিনি বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের খরচ চালাতে বাগেরহাট শহরের রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের শিফটে খণ্ডকালীন চাকরি করেন।বাবার দাফন শেষে মঙ্গলবার রাতেই তিনি কর্মস্থলে ফিরে যান। রাত ১০টার দিকেও তাকে এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। চোখে বাবাকে হারানোর অশ্রু, হৃদয়ে গভীর শোক—তবু থেমে থাকেননি তিনি। কারণ পরদিন, ২২ জুলাই, তার এইচএসসি পরীক্ষার ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের পরীক্ষা। একদিকে প্রিয় বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে মানসিক ভারসাম্যহীন বড় ভাই, সংসারের দায়িত্ব এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম—সব মিলিয়ে ইকনের জীবন যেন কঠিন বাস্তবতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ খোন্দকার আছিফ উদ্দিন রাখী বলেন,ইকন আমাদের কলেজের ছাত্র।ইকনের জীবনের এই কঠিন মুহূর্ত আমাদের সবাইকে ব্যথিত করেছে। এত বড় ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও সে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও চাকরি চালিয়ে যাচ্ছে, যা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। কলেজের পক্ষ থেকে আমরা তার পাশে আছি। প্রয়োজনে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। আমরা তার প্রয়াত বাবার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং ইকনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।

ইকনের এই সংগ্রামের গল্প ইতোমধ্যে স্থানীয়দের আবেগাপ্লুত করেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দায়িত্ববোধ, পরিবারকে আগলে রাখার চেষ্টা এবং শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তি অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার হয়ে উঠেছে। স্থানীয়রা ইকন ও তার পরিবারের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন।