Dhaka , Sunday, 13 September 2026
শিরোনাম :
কচুয়ায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে জয় ঢাকার টপ ছিনতাইকারী আলামীনকে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।। তিন শতাধিক বাস, হাজারো যাত্রী,বেহাল টার্মিনালে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি মহিলাদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বাগেরহাটে আলোচনা সভা বাগেরহাটে কিশোরীদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রশিক্ষণ, চেক ও চারা বিতরণ মাছ-সবজির স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা, এখন আলুর ভরসায় ধুঁকছে বাগেরহাটের প্রথম কোল্ড স্টোরেজ কাপড় পেঁচিয়ে ফুটবল খেলা, মাদ্রাসাছাত্রদের হাতে বল তুলে দিলেন এডিসি বাগেরহাটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা বাগেরহাটে IELTS ও জাপানি ভাষা শিক্ষা নিয়ে সেমিনার বাগেরহাট পৌরসভার সড়ক উন্নয়নে অনিয়মের অভিযোগ, পুরোনো ঠিকাদারের হাতেই একাধিক কাজ,

আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত থেকে ৫ আগস্টের বিজয়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : 06:54:39 pm, Wednesday, 5 August 2026
  • 68 বার

‎বিশেষ প্রতিবেদক।

১৬ জুলাই রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গুলি চলে। সেই সময় দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে যান আবু সাঈদ। মুহূর্তের মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেই দৃশ্য ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। রংপুরে আন্দোলন আর কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শ্রমজীবী মানুষ, অভিভাবক—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। আবু সাঈদের মৃত্যু হয়ে ওঠে প্রতিবাদের নতুন ভাষা।

দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণের নাম আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে তার রক্তাক্ত আত্মত্যাগ শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল একটি রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। তার মৃত্যুর পর রংপুরে শুরু হওয়া জনরোষ অল্প সময়ের মধ্যেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঘটনায় পরিণত হয়। দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি আজও রংপুরের অলিগলি, রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং শহীদ পরিবারের চোখের অশ্রুতে জীবন্ত। একদিকে আছে বিজয়ের স্মৃতি, অন্যদিকে আছে বিচার না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। আন্দোলনে শহীদ ছয়জনের পরিবারের সদস্যরা এখনও অপেক্ষা করছেন ন্যায়বিচারের জন্য। আহতদের অনেকে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। আর তদন্তের ধীরগতি ও বিচারহীনতা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

‎১৮ জুলাই বিকেলে রংপুর নগরীর মডার্ন মোড়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া। এরপর উত্তেজিত জনতা জেলা আওয়ামী লীগ, মহানগর আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ কার্যালয়, মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি অফিস, তাজহাট থানা ও নবাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সেদিন থেকেই আন্দোলনের চরিত্র পাল্টে যায়। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯ জুলাই বিএনপির দলীয় কার্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হলে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা তাতে যোগ দেন। মিছিলটি সিটি করপোরেশনের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও সরাসরি গুলিতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। সেদিন নিহত হন  সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন।স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন। ফল ব্যবসায়ী মেরাজুল ইসলাম। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ-আল তাহির। একই দিনে শতাধিক মানুষ আহত হন।

‎৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণার পর রংপুরে নতুন মোড় নেয় আন্দোলন। সকালের বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী, নারী, প্রবীণ, শ্রমজীবী—সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে রংপুরে নজিরবিহীন গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। সেদিন পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ঘটনাও আলোচনায় আসে। অনেকে মনে করেন, সেই দিন থেকেই আন্দোলনের বিজয়ের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করে।  ৪ আগস্ট সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের অনেকের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র, লাঠি, লোহার পাইপ এবং আগ্নেয়াস্ত্র। দুপুরে জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে আওয়ামী লীগের মিছিল বের হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে টাউন হল, সিটি বাজার, সুপার মার্কেট, সিটি করপোরেশন এলাকা, পায়রা চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। দফায় দফায় হামলা, পাল্টা হামলা ও গুলির ঘটনায় পাঁচজন নিহত হন। সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। শতাধিক আহতকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।অনেক আহত ব্যক্তি পুলিশি ঝামেলার ভয়ে চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি ফিরে যান। ৪ আগস্টের সংঘর্ষে নগরীর জুম্মাপাড়ার আবেদ আলী একটি চোখ হারান। পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী ও আলমনগরের মমদেল হোসেন পুলিশের গুলিতে পা হারান। জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী বলেন, তিনি নিজের চেম্বারে ছিলেন। অভিযোগ করে তিনি বলেন, পুলিশ চেম্বারের শাটার ভেঙে গুলি চালায়। সেই গুলিতে তার বাম পা নষ্ট হয়ে যায়। তার ভাষায়, “এমন ভয়াবহ দিন যেন আর কখনো বাংলাদেশে ফিরে না আসে।”              ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুরজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। শাপলা চত্বর, পায়রা চত্বর, টাউন হল, প্রেসক্লাব, জাহাজ কোম্পানি মোড়, শহীদ আবু সাঈদ চত্বর, পার্ক মোড়, জিলা স্কুল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় বিজয় মিছিল বের হয়। হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন পৃথকভাবে আনন্দ মিছিল বের করে।কোথাও মিষ্টি বিতরণ করা হয়, কোথাও শুকরিয়া নামাজ আদায় করা হয়।

‎জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত ছয়জনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর কোনো একটিতেও দীর্ঘ সময় ধরে চার্জশিট আদালতে জমা না পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতদের পরিবার ও আন্দোলনের নেতারা। এসব মামলায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ মোট ২ হাজার ৬৩৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে এখনো গ্রেপ্তার না করায় প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনের সংগঠকরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ বলেন,”যেদিন আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিনই দমননীতির পতনের সূচনা হয়েছিল। তার সেই আত্মত্যাগ দেশের মানুষকে রাজপথে নামতে সাহস জুগিয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রকাশ্যে গুলি চালানো ব্যক্তিদের অনেকেই এখনও বিচারের বাইরে রয়ে গেছেন।” নিহত সাজ্জাদ হোসেনের মা ময়না বেগম বলেন,”দুই বছর পার হয়ে গেল। বড় বড় আসামিদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। আমি শুধু আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই।” নিহত মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন বলেন, “আমার সন্তানরা বাবাকে হারিয়েছে। সংসারের সব দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়। আমরা শুধু চাই, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক।”

‎মামলার তদন্ত নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবার প্রভাবশালীদের নাম বাদ দিতে বাদীদের দিয়ে হলফনামা করানোর অভিযোগও রয়েছে। সিনিয়র আইনজীবী রইছ উদ্দিন বাদশা বলেন, এ ধরনের হলফনামার আইনগত মূল্য সীমিত হলেও এতে মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে আন্দোলনের সাবেক মহানগর সমন্বয়ক নাহিদ হাসান খন্দকার দাবি করেন, প্রকৃত নির্দেশদাতা ও গুলি চালানো ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি। তবে তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। শহীদ আবু সাঈদ চত্বর, মডার্ন মোড়, জাহাজ কোম্পানি মোড়, টাউন হল কিংবা সিটি বাজার—রংপুরের এসব স্থান আজও বহন করে এক রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মৃতি। আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত শুধু একটি ছবির নাম নয় অনেকের কাছে তা সাহস, আত্মত্যাগ, গণপ্রতিরোধ এবং ইতিহাস বদলে দেওয়া এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তবে সেই ইতিহাসের পূর্ণতা আসবে কেবল তখনই, যখন নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে এবং আহতদের ত্যাগ যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মানের মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

khan

জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে জয়

আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত থেকে ৫ আগস্টের বিজয়

আপডেট টাইম : 06:54:39 pm, Wednesday, 5 August 2026

‎বিশেষ প্রতিবেদক।

১৬ জুলাই রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গুলি চলে। সেই সময় দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে যান আবু সাঈদ। মুহূর্তের মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেই দৃশ্য ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। রংপুরে আন্দোলন আর কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শ্রমজীবী মানুষ, অভিভাবক—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। আবু সাঈদের মৃত্যু হয়ে ওঠে প্রতিবাদের নতুন ভাষা।

দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণের নাম আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে তার রক্তাক্ত আত্মত্যাগ শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল একটি রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। তার মৃত্যুর পর রংপুরে শুরু হওয়া জনরোষ অল্প সময়ের মধ্যেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঘটনায় পরিণত হয়। দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি আজও রংপুরের অলিগলি, রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং শহীদ পরিবারের চোখের অশ্রুতে জীবন্ত। একদিকে আছে বিজয়ের স্মৃতি, অন্যদিকে আছে বিচার না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। আন্দোলনে শহীদ ছয়জনের পরিবারের সদস্যরা এখনও অপেক্ষা করছেন ন্যায়বিচারের জন্য। আহতদের অনেকে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। আর তদন্তের ধীরগতি ও বিচারহীনতা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

‎১৮ জুলাই বিকেলে রংপুর নগরীর মডার্ন মোড়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া। এরপর উত্তেজিত জনতা জেলা আওয়ামী লীগ, মহানগর আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ কার্যালয়, মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি অফিস, তাজহাট থানা ও নবাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সেদিন থেকেই আন্দোলনের চরিত্র পাল্টে যায়। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯ জুলাই বিএনপির দলীয় কার্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হলে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা তাতে যোগ দেন। মিছিলটি সিটি করপোরেশনের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও সরাসরি গুলিতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। সেদিন নিহত হন  সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন।স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন। ফল ব্যবসায়ী মেরাজুল ইসলাম। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ-আল তাহির। একই দিনে শতাধিক মানুষ আহত হন।

‎৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণার পর রংপুরে নতুন মোড় নেয় আন্দোলন। সকালের বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী, নারী, প্রবীণ, শ্রমজীবী—সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে রংপুরে নজিরবিহীন গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। সেদিন পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ঘটনাও আলোচনায় আসে। অনেকে মনে করেন, সেই দিন থেকেই আন্দোলনের বিজয়ের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করে।  ৪ আগস্ট সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের অনেকের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র, লাঠি, লোহার পাইপ এবং আগ্নেয়াস্ত্র। দুপুরে জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে আওয়ামী লীগের মিছিল বের হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে টাউন হল, সিটি বাজার, সুপার মার্কেট, সিটি করপোরেশন এলাকা, পায়রা চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। দফায় দফায় হামলা, পাল্টা হামলা ও গুলির ঘটনায় পাঁচজন নিহত হন। সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। শতাধিক আহতকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।অনেক আহত ব্যক্তি পুলিশি ঝামেলার ভয়ে চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি ফিরে যান। ৪ আগস্টের সংঘর্ষে নগরীর জুম্মাপাড়ার আবেদ আলী একটি চোখ হারান। পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী ও আলমনগরের মমদেল হোসেন পুলিশের গুলিতে পা হারান। জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী বলেন, তিনি নিজের চেম্বারে ছিলেন। অভিযোগ করে তিনি বলেন, পুলিশ চেম্বারের শাটার ভেঙে গুলি চালায়। সেই গুলিতে তার বাম পা নষ্ট হয়ে যায়। তার ভাষায়, “এমন ভয়াবহ দিন যেন আর কখনো বাংলাদেশে ফিরে না আসে।”              ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুরজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। শাপলা চত্বর, পায়রা চত্বর, টাউন হল, প্রেসক্লাব, জাহাজ কোম্পানি মোড়, শহীদ আবু সাঈদ চত্বর, পার্ক মোড়, জিলা স্কুল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় বিজয় মিছিল বের হয়। হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন পৃথকভাবে আনন্দ মিছিল বের করে।কোথাও মিষ্টি বিতরণ করা হয়, কোথাও শুকরিয়া নামাজ আদায় করা হয়।

‎জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত ছয়জনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর কোনো একটিতেও দীর্ঘ সময় ধরে চার্জশিট আদালতে জমা না পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতদের পরিবার ও আন্দোলনের নেতারা। এসব মামলায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ মোট ২ হাজার ৬৩৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে এখনো গ্রেপ্তার না করায় প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনের সংগঠকরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ বলেন,”যেদিন আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিনই দমননীতির পতনের সূচনা হয়েছিল। তার সেই আত্মত্যাগ দেশের মানুষকে রাজপথে নামতে সাহস জুগিয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রকাশ্যে গুলি চালানো ব্যক্তিদের অনেকেই এখনও বিচারের বাইরে রয়ে গেছেন।” নিহত সাজ্জাদ হোসেনের মা ময়না বেগম বলেন,”দুই বছর পার হয়ে গেল। বড় বড় আসামিদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। আমি শুধু আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই।” নিহত মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন বলেন, “আমার সন্তানরা বাবাকে হারিয়েছে। সংসারের সব দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়। আমরা শুধু চাই, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক।”

‎মামলার তদন্ত নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবার প্রভাবশালীদের নাম বাদ দিতে বাদীদের দিয়ে হলফনামা করানোর অভিযোগও রয়েছে। সিনিয়র আইনজীবী রইছ উদ্দিন বাদশা বলেন, এ ধরনের হলফনামার আইনগত মূল্য সীমিত হলেও এতে মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে আন্দোলনের সাবেক মহানগর সমন্বয়ক নাহিদ হাসান খন্দকার দাবি করেন, প্রকৃত নির্দেশদাতা ও গুলি চালানো ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি। তবে তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। শহীদ আবু সাঈদ চত্বর, মডার্ন মোড়, জাহাজ কোম্পানি মোড়, টাউন হল কিংবা সিটি বাজার—রংপুরের এসব স্থান আজও বহন করে এক রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মৃতি। আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত শুধু একটি ছবির নাম নয় অনেকের কাছে তা সাহস, আত্মত্যাগ, গণপ্রতিরোধ এবং ইতিহাস বদলে দেওয়া এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তবে সেই ইতিহাসের পূর্ণতা আসবে কেবল তখনই, যখন নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে এবং আহতদের ত্যাগ যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মানের মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে।