Dhaka , Sunday, 13 September 2026
শিরোনাম :
কচুয়ায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে জয় ঢাকার টপ ছিনতাইকারী আলামীনকে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।। তিন শতাধিক বাস, হাজারো যাত্রী,বেহাল টার্মিনালে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি মহিলাদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বাগেরহাটে আলোচনা সভা বাগেরহাটে কিশোরীদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রশিক্ষণ, চেক ও চারা বিতরণ মাছ-সবজির স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা, এখন আলুর ভরসায় ধুঁকছে বাগেরহাটের প্রথম কোল্ড স্টোরেজ কাপড় পেঁচিয়ে ফুটবল খেলা, মাদ্রাসাছাত্রদের হাতে বল তুলে দিলেন এডিসি বাগেরহাটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা বাগেরহাটে IELTS ও জাপানি ভাষা শিক্ষা নিয়ে সেমিনার বাগেরহাট পৌরসভার সড়ক উন্নয়নে অনিয়মের অভিযোগ, পুরোনো ঠিকাদারের হাতেই একাধিক কাজ,

দড়ি টেনে নৌকা পাড় করেন প্রতিবন্ধী জনি, সেই আয়ে চলে ছয় সদস্যের সংসার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : 09:41:44 pm, Sunday, 6 September 2026
  • 89 বার

বাগেরহাট প্রতিনিধি

বয়স ৩৫ বছর কিন্তু দেখলে মনে হয় বয়স যেন আরও কম। মুখে তারুণ্যের ছাপ থাকলেও জীবনসংগ্রাম তাকে প্রতিদিনই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অন্য কোনো কাজ করার সামর্থ্যও নেই। তাই ভোর হলেই হাতে তুলে নেন নৌকার সঙ্গে বাঁধা দড়ি। নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে দড়ি টেনে নৌকা পার করেন মানুষ। আর এই কাজ থেকে পাওয়া সামান্য আয় তুলে দেন বাবার হাতে। সেই টাকাতেই চলে পরিবারের ছয় সদস্যের সংসার। জনি মোল্লা বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কুলিয়া দাইড় গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা মনি মোল্লা। ছোটবেলা থেকেই নৌকা চালানোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন জনি। কখনো বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরেছেন, আবার কখনো নৌকা চালিয়ে মানুষ পারাপার করেছেন। দীর্ঘ আট বছর ধরে বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের যাত্রাপুর বাজারসংলগ্ন কুলিয়া দাইড় খেয়াঘাটে দড়ি টেনে মানুষ পারাপারের সহযোগিতা করছেন তিনি।

ভৈরব নদীর ওপর অবস্থিত এই খেয়াঘাটটি দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। প্রতিদিন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীসহ প্রায় ৭০০ মানুষ এই ঘাট দিয়ে নদী পারাপার হন। ঘাটে নৌকা এলেই শুরু হয় জনির কাজ। নৌকার সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ি ধরে নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে টানতে থাকেন তিনি। নদীর স্রোত, রোদ কিংবা বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাঁর কর্মযাত্রা থামাতে পারে না। প্রতিদিন সকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘাটে থাকতে হয় তাঁকে। তবে সবসময় একটানা কাজ করতে পারেন না। শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে কখনো সুস্থ থাকলে নৌকা চালান, আবার অসুস্থ হলে বিরতি নেন। তবুও পরিবারের কথা মনে করে সুযোগ পেলেই আবার হাতে তুলে নেন দড়ি।

জনি মোল্লা বলেন,ছোটবেলা থেকেই নৌকা চালাই। এই ঘাটে প্রায় আট বছর ধরে কাজ করছি। আমার শারীরিক ও মানসিক সমস্যা আছে। তারপরও সংসারের জন্য কাজ করতে হয়। আমার পরিবারের ছয়জন সদস্য। দিনে ৪০০ টাকা পাই। এই টাকা পুরোটা আব্বুর হাতে দিয়ে দিই। আব্বু এই টাকা দিয়ে সংসার চালান। সকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘাটে থাকি। ঘাটে নিয়মিত যাতায়াতকারী মনিরা বেগম বলেন, জনির বয়স ৩২-৩৩ বছরের মতো হবে। দেখলে বোঝা যায় না। ওর শারীরিক সমস্যা আছে, একটু মানসিক সমস্যাও আছে। এই খেয়া টানা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে পারে না। সাত-আট বছর ধরে এই কাজ করেই সংসার চালাচ্ছে। আগে বাবার সঙ্গে জাল ধরত। এখন খেয়া টেনেই সংসার চলে। গরিব ও প্রতিবন্ধী মানুষটাকে যদি একটু আর্থিক সহযোগিতা করা যায়, তাহলে ভালোভাবে চলতে পারবে। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, অনেকদিন ধরে জনিকে এই নৌকা চালাতে দেখছি। ছেলেটার মানসিক সমস্যা আছে। অন্য কোনো কাজ করতে পারে না। তারপরও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এই কাজ করে যাচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নদীর ঘাটে পড়ে থাকে।

ঘাটের ইজারাদার মোঃ মাসুম মোল্লা বলেন,জনি দীর্ঘদিন ধরে এখানে দড়ি টেনে মানুষ পারাপারের কাজ করছে। ওকে তিন বেলা খেতে দিই, চা-নাশতা দিই এবং ৪০০ টাকা বেতন দিই। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ওর পেছনে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়। ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত যখন সুস্থ থাকে, তখন খেয়া চালায়। তিনি আরও বলেন, জনি প্রতিবন্ধী ও খুবই গরিব। ওর কোনো জায়গা-জমি নেই, নিজের বলতে কিছুই নেই। ওর বাবা মাছ ধরে। জনি যে ৪০০ টাকা পায়, সেটাও পুরোটা বাবার হাতে তুলে দেয়। সেই টাকা দিয়েই সংসার চলে। ওর পরিবারে ছয়জন সদস্য। যদি জনিকে একটু সাহায্য-সহযোগিতা করা যায়, তাহলে সে আরও ভালোভাবে বাঁচতে পারবে। স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই নদী ও নৌকার সঙ্গে জনির পথচলা। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে নিয়মিত কাজ করেন তিনি। ভৈরব নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিদিন শত শত মানুষকে পারাপারে সহযোগিতা করেন জনি। প্রায় ৭০০ মানুষের চলাচলের এই ঘাটে তাঁর হাতে থাকা দড়িই পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। বড় কোনো স্বপ্ন নেই তাঁর—শুধু পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়াই তাঁর একমাত্র চাওয়া।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

khan

জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে জয়

দড়ি টেনে নৌকা পাড় করেন প্রতিবন্ধী জনি, সেই আয়ে চলে ছয় সদস্যের সংসার

আপডেট টাইম : 09:41:44 pm, Sunday, 6 September 2026

বাগেরহাট প্রতিনিধি

বয়স ৩৫ বছর কিন্তু দেখলে মনে হয় বয়স যেন আরও কম। মুখে তারুণ্যের ছাপ থাকলেও জীবনসংগ্রাম তাকে প্রতিদিনই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অন্য কোনো কাজ করার সামর্থ্যও নেই। তাই ভোর হলেই হাতে তুলে নেন নৌকার সঙ্গে বাঁধা দড়ি। নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে দড়ি টেনে নৌকা পার করেন মানুষ। আর এই কাজ থেকে পাওয়া সামান্য আয় তুলে দেন বাবার হাতে। সেই টাকাতেই চলে পরিবারের ছয় সদস্যের সংসার। জনি মোল্লা বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কুলিয়া দাইড় গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা মনি মোল্লা। ছোটবেলা থেকেই নৌকা চালানোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন জনি। কখনো বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরেছেন, আবার কখনো নৌকা চালিয়ে মানুষ পারাপার করেছেন। দীর্ঘ আট বছর ধরে বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের যাত্রাপুর বাজারসংলগ্ন কুলিয়া দাইড় খেয়াঘাটে দড়ি টেনে মানুষ পারাপারের সহযোগিতা করছেন তিনি।

ভৈরব নদীর ওপর অবস্থিত এই খেয়াঘাটটি দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। প্রতিদিন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীসহ প্রায় ৭০০ মানুষ এই ঘাট দিয়ে নদী পারাপার হন। ঘাটে নৌকা এলেই শুরু হয় জনির কাজ। নৌকার সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ি ধরে নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে টানতে থাকেন তিনি। নদীর স্রোত, রোদ কিংবা বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাঁর কর্মযাত্রা থামাতে পারে না। প্রতিদিন সকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘাটে থাকতে হয় তাঁকে। তবে সবসময় একটানা কাজ করতে পারেন না। শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে কখনো সুস্থ থাকলে নৌকা চালান, আবার অসুস্থ হলে বিরতি নেন। তবুও পরিবারের কথা মনে করে সুযোগ পেলেই আবার হাতে তুলে নেন দড়ি।

জনি মোল্লা বলেন,ছোটবেলা থেকেই নৌকা চালাই। এই ঘাটে প্রায় আট বছর ধরে কাজ করছি। আমার শারীরিক ও মানসিক সমস্যা আছে। তারপরও সংসারের জন্য কাজ করতে হয়। আমার পরিবারের ছয়জন সদস্য। দিনে ৪০০ টাকা পাই। এই টাকা পুরোটা আব্বুর হাতে দিয়ে দিই। আব্বু এই টাকা দিয়ে সংসার চালান। সকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘাটে থাকি। ঘাটে নিয়মিত যাতায়াতকারী মনিরা বেগম বলেন, জনির বয়স ৩২-৩৩ বছরের মতো হবে। দেখলে বোঝা যায় না। ওর শারীরিক সমস্যা আছে, একটু মানসিক সমস্যাও আছে। এই খেয়া টানা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে পারে না। সাত-আট বছর ধরে এই কাজ করেই সংসার চালাচ্ছে। আগে বাবার সঙ্গে জাল ধরত। এখন খেয়া টেনেই সংসার চলে। গরিব ও প্রতিবন্ধী মানুষটাকে যদি একটু আর্থিক সহযোগিতা করা যায়, তাহলে ভালোভাবে চলতে পারবে। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, অনেকদিন ধরে জনিকে এই নৌকা চালাতে দেখছি। ছেলেটার মানসিক সমস্যা আছে। অন্য কোনো কাজ করতে পারে না। তারপরও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এই কাজ করে যাচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নদীর ঘাটে পড়ে থাকে।

ঘাটের ইজারাদার মোঃ মাসুম মোল্লা বলেন,জনি দীর্ঘদিন ধরে এখানে দড়ি টেনে মানুষ পারাপারের কাজ করছে। ওকে তিন বেলা খেতে দিই, চা-নাশতা দিই এবং ৪০০ টাকা বেতন দিই। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ওর পেছনে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়। ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত যখন সুস্থ থাকে, তখন খেয়া চালায়। তিনি আরও বলেন, জনি প্রতিবন্ধী ও খুবই গরিব। ওর কোনো জায়গা-জমি নেই, নিজের বলতে কিছুই নেই। ওর বাবা মাছ ধরে। জনি যে ৪০০ টাকা পায়, সেটাও পুরোটা বাবার হাতে তুলে দেয়। সেই টাকা দিয়েই সংসার চলে। ওর পরিবারে ছয়জন সদস্য। যদি জনিকে একটু সাহায্য-সহযোগিতা করা যায়, তাহলে সে আরও ভালোভাবে বাঁচতে পারবে। স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই নদী ও নৌকার সঙ্গে জনির পথচলা। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে নিয়মিত কাজ করেন তিনি। ভৈরব নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিদিন শত শত মানুষকে পারাপারে সহযোগিতা করেন জনি। প্রায় ৭০০ মানুষের চলাচলের এই ঘাটে তাঁর হাতে থাকা দড়িই পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। বড় কোনো স্বপ্ন নেই তাঁর—শুধু পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়াই তাঁর একমাত্র চাওয়া।