নিজস্ব প্রতিবেদক,বাগেরহাট
বাগেরহাটে ইয়াবা ব্যবসার এক নতুন ও ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ইয়াবা সুন্দরী’ নামে একদল নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে (বিশেষ করে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ) ব্যবহার করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। এদের টার্গেটের তালিকায় আছেন ব্যবসায়ী, পুলিশ, ডাক্তার, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনীতিবিদ পর্যন্ত। অভিযোগ রয়েছে, জেলার কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্য এই নারী চক্রকে নিজেদের সোর্স হিসেবে ব্যবহার করেন। আবার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা ও সাংবাদিকরা তাদের ‘সুরক্ষা’ দিয়ে থাকেন। বিনিময়ে এসব ব্ল্যাকমেইল বা মাদক ব্যবসার লাভের একটি অংশ পেয়ে থাকেন তারাও। ভুক্তভোগীদের অনেকেই সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক সম্মান বা পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কায় চুপ থাকছেন। কেউ কেউ সর্বস্ব হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, তবে মুখ খুলতে সাহস করছেন না।জেলা গোয়েন্দা সূত্র ও ভুক্তভোগী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব ইয়াবা সুন্দরীরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। এরপর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে শুরু হয় ভিডিও কলে নগ্ন বা অর্ধনগ্ন হয়ে কথোপকথন। সেই কল রেকর্ড করে পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠানোর ভয় দেখিয়ে মানসিকভাবে জিম্মি করে ফেলা হয় ভুক্তভোগীদের। এভাবেই বাগেরহাট সদর উপজেলায় গড়ে উঠেছে অন্তত ৪টির ও বেশি সক্রিয় চক্র। তারা শুধু ব্ল্যাকমেইলই নয়, একই সঙ্গে মাদক বহন ও খুচরা বিক্রির সাথেও সরাসরি জড়িত। জেলার বেশ কিছু কুখ্যাত ইয়াবা ব্যবসায়ীর ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার কাজও করে থাকে এসব নারীরা। কখনও কখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তারা গ্রেপ্তার হলেও তাদের মদদ দাতা বা আশ্রয় দাতারা থাকেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।বাগেরহাট পৌর এলাকার একজন শিক্ষক ও একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এসব নারীদের সঙ্গে প্রথমে ফেসবুকে পরিচয় হয়। এই চক্রের কার্যক্রম শুরু হয় সাধারণ ‘হাই-হ্যালো’ দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার পর কৌশলে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবে সাড়া দিলেই শুরু হয় মূল ফাঁদ পাতার কাজ। একপর্যায়ে ভুক্তভোগীকে ফোন বা ভিডিও কলে কথা বলার জন্য রাজি করানো হয়। হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল রিসিভ করলেই বিপদ! অপরপ্রান্তে থাকে এক তরুণী, যিনি থাকেন নগ্ন অবস্থায়। এক থেকে দুই মিনিট কলটি চালু থাকলেই সেই ভিডিও তারা গোপনে রেকর্ড করে রাখে। এরপর শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল। ওই ভিডিও পাঠিয়ে দেওয়া হবে আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। হুমকি দিয়ে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। কেউ অপারগতা প্রকাশ করলে আরও ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েন। অনেকে সামাজিক সম্মান রক্ষায় চুপচাপটাকা দিয়ে দেন। কেউ আবার নিঃস্ব হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।বাগেরহাট জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাগেরহাট সদর উপজেলায় এসব ইয়াবা সুন্দরীদের অন্তত ৪টি সক্রিয় চক্র রয়েছে। এই চক্রে যুক্ত নারী সদস্যের সংখ্যা ৭/৮ জন এবং পুরুষ সদস্য রয়েছে ৮ থেকে ১০ জন। তারা নিয়মিত ইয়াবা বহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে নিজেরাও মাদক সেবন ও খুচরা বিক্রিতে জড়িত। তিনি আরও জানান, এই নারী সদস্যদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সঙ্গে জড়িত কিছু অসাধু পুলিশ সদস্য, যারা নিয়মিত এই টাকার ভাগ নেন। শুধু তাই নয়, জেলা সদরের একাধিক রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় নির্বিঘ্নে চলছে এই চক্রের দেহ ও মাদকব্যবসা এবং অপরাধমূলক কার্যক্রম। এই চক্রের হাতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, ব্যবসায়ী, পুলিশ, ডাক্তার, শিক্ষক, স্বর্ণকারসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কিন্তু লোকলজ্জা, সম্মান ও ভয় কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস করছেন না। ফলে অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে, বরং তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, এসব অপরাধ দমনে প্রয়োজন প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, স্বচ্ছ তদন্ত এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়া সরিয়ে নিরপেক্ষ বিচার। নইলে বাগেরহাটে সমাজব্যবস্থা এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাগেরহাটে ইয়াবা ও ব্ল্যাকমেইল চক্রের এই নতুন রূপ সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. তহিদুল আরিফ বলেন, আমরা নিয়মিত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। এসব অভিযানে ইয়াবাসহ বেশ কিছু নারীকে আটকও করা হয়েছে। তবে উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, এই নারী চক্রের অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ডাক্তারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করছে।তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের অনেকে লোকলজ্জা ও সামাজিক মর্যাদা হারানোর ভয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না। এমনকি অনেকেই আমাদের সঙ্গে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতেও অনিচ্ছুক। ফলে এসব অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে আমাদের বাড়তি বেগ পেতে হচ্ছে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে পুলিশ সুপার আরও বলেন, অপরিচিত কেউ হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুক মেসেঞ্জারে নক করলে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া না দেওয়া এবং সতর্ক থাকা জরুরি। না হলে আপনি সহজেই ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদে পড়ে যেতে পারেন। বর্তমানে প্রায় সবাই ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করছেন, তাই সচেতনতা আরও বেশি জরুরি।এই চক্রকে ধরতে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। আমরা আশাবাদী, খুব দ্রুতই এই চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হব।
শিশুদের পড়িয়ে, হাটে বড়ই বিক্রি করে এসএসসিতে এ প্লাস পেল দুর্জয়
Reporter Name 



















