Dhaka , Sunday, 13 September 2026
শিরোনাম :
কচুয়ায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে জয় ঢাকার টপ ছিনতাইকারী আলামীনকে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।। তিন শতাধিক বাস, হাজারো যাত্রী,বেহাল টার্মিনালে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি মহিলাদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বাগেরহাটে আলোচনা সভা বাগেরহাটে কিশোরীদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রশিক্ষণ, চেক ও চারা বিতরণ মাছ-সবজির স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা, এখন আলুর ভরসায় ধুঁকছে বাগেরহাটের প্রথম কোল্ড স্টোরেজ কাপড় পেঁচিয়ে ফুটবল খেলা, মাদ্রাসাছাত্রদের হাতে বল তুলে দিলেন এডিসি বাগেরহাটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা বাগেরহাটে IELTS ও জাপানি ভাষা শিক্ষা নিয়ে সেমিনার বাগেরহাট পৌরসভার সড়ক উন্নয়নে অনিয়মের অভিযোগ, পুরোনো ঠিকাদারের হাতেই একাধিক কাজ,

১১ বছর ধরে দরজার দিকে চেয়ে আছেন মা, ফিরেনি সাগরে হারিয়ে যাওয়া নিয়ামুল

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : 02:45:49 pm, Wednesday, 8 July 2026
  • 18 বার

নিজস্ব প্রতিবেদক।

প্রতিদিনের মতো ঘরের কোণে রাখা একটি ছবির সামনে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকেন রোকেয়া বেগম। ছবিটি তার বড় ছেলে নিয়ামুল হোসেনের। তারপর ধীরে ধীরে চোখ যায় ঘরের দরজার দিকে। হয়তো আজ, হয়তো কাল—একদিন ছেলে ফিরে এসে ডাকবে, “মা, আমি এসেছি।” এই আশাতেই কেটে গেছে এক যুগের কাছাকাছি সময়। কিন্তু অপেক্ষার অবসান হয়নি।

বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বগা জেলে পল্লীর বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৬৫) ও তার স্বামী শুকুর আলীর (৭০) জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনার নাম নিয়ামুল হোসেন। ২০১৫ সালে জীবিকার তাগিদে অন্য জেলেদের সঙ্গে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন তিনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হয়নি। তার সঙ্গে থাকা অন্যরা ফিরে এলেও নিয়ামুল আর ঘরে ফেরেননি। পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, সাগরে বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়ো পরিস্থিতির মধ্যে কোথাও হারিয়ে যান তিনি। এরপর বহু খোঁজাখুঁজি, অনুসন্ধান ও অপেক্ষার পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। কিন্তু মায়ের বিশ্বাস এখনও অটুট—তার ছেলে একদিন ফিরে আসবে। নিয়ামুলের ছোট ভাই বাশার বলেন,ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাদের পরিবারের জীবন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বহু জায়গায় খোঁজ করেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তাদের মা এখনও প্রতিটি শব্দে চমকে ওঠেন। দরজায় সামান্য আওয়াজ হলেই মনে করেন নিয়ামুল ফিরে এসেছে। সেই অপেক্ষা আর কান্না পুরো পরিবারকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়।বৃদ্ধ বাবা শুকুর আলী বলেন, ছেলেকে হারানোর শোক কখনও কমেনি। বয়সের ভারে এখন আর কাজ করার শক্তিও নেই। সংসারের অভাবের সঙ্গে যোগ হয়েছে ছেলেকে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার একটাই আকাঙ্ক্ষা—মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলের কোনো খোঁজ জানতে পারা। রোকেয়া বেগমের কণ্ঠে এখনও আশার সুর। তিনি বলেন,১১ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমার ছেলে কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। প্রতিদিন তার জন্য অপেক্ষা করি। আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি, মৃত্যুর আগে যেন একবার তাকে দেখতে পারি।

স্থানীয় বাসিন্দা একলাস হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি চরম কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করছে। বৃদ্ধ বাবা-মা এখনও ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন। মানবিক কারণে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ছোট ছেলের সীমিত আয়েই কোনো রকমে সংসার চলছে। একটি ছোট ঘরে বসবাস করছেন বৃদ্ধ দম্পতি। নিয়ামুল নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ ১১ বছর পার হলেও তারা কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসন সুবিধা পাননি বলে অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। আবেদন পেলে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উপকূলীয় অঞ্চলের অসংখ্য জেলে পরিবারের মতো নিয়ামুলের পরিবারও আজ অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার এক দীর্ঘ অধ্যায়ের মধ্যে বন্দি। সাগরে হারিয়ে যাওয়া একজন সন্তানের ফিরে আসার আশায় দিন গুনছেন বৃদ্ধ মা-বাবা। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও তাদের চোখের সেই প্রতীক্ষা আজও ফুরায়নি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

khan

জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে জয়

১১ বছর ধরে দরজার দিকে চেয়ে আছেন মা, ফিরেনি সাগরে হারিয়ে যাওয়া নিয়ামুল

আপডেট টাইম : 02:45:49 pm, Wednesday, 8 July 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক।

প্রতিদিনের মতো ঘরের কোণে রাখা একটি ছবির সামনে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকেন রোকেয়া বেগম। ছবিটি তার বড় ছেলে নিয়ামুল হোসেনের। তারপর ধীরে ধীরে চোখ যায় ঘরের দরজার দিকে। হয়তো আজ, হয়তো কাল—একদিন ছেলে ফিরে এসে ডাকবে, “মা, আমি এসেছি।” এই আশাতেই কেটে গেছে এক যুগের কাছাকাছি সময়। কিন্তু অপেক্ষার অবসান হয়নি।

বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বগা জেলে পল্লীর বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৬৫) ও তার স্বামী শুকুর আলীর (৭০) জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনার নাম নিয়ামুল হোসেন। ২০১৫ সালে জীবিকার তাগিদে অন্য জেলেদের সঙ্গে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন তিনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হয়নি। তার সঙ্গে থাকা অন্যরা ফিরে এলেও নিয়ামুল আর ঘরে ফেরেননি। পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, সাগরে বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়ো পরিস্থিতির মধ্যে কোথাও হারিয়ে যান তিনি। এরপর বহু খোঁজাখুঁজি, অনুসন্ধান ও অপেক্ষার পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। কিন্তু মায়ের বিশ্বাস এখনও অটুট—তার ছেলে একদিন ফিরে আসবে। নিয়ামুলের ছোট ভাই বাশার বলেন,ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাদের পরিবারের জীবন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বহু জায়গায় খোঁজ করেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তাদের মা এখনও প্রতিটি শব্দে চমকে ওঠেন। দরজায় সামান্য আওয়াজ হলেই মনে করেন নিয়ামুল ফিরে এসেছে। সেই অপেক্ষা আর কান্না পুরো পরিবারকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়।বৃদ্ধ বাবা শুকুর আলী বলেন, ছেলেকে হারানোর শোক কখনও কমেনি। বয়সের ভারে এখন আর কাজ করার শক্তিও নেই। সংসারের অভাবের সঙ্গে যোগ হয়েছে ছেলেকে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার একটাই আকাঙ্ক্ষা—মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলের কোনো খোঁজ জানতে পারা। রোকেয়া বেগমের কণ্ঠে এখনও আশার সুর। তিনি বলেন,১১ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমার ছেলে কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। প্রতিদিন তার জন্য অপেক্ষা করি। আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি, মৃত্যুর আগে যেন একবার তাকে দেখতে পারি।

স্থানীয় বাসিন্দা একলাস হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি চরম কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করছে। বৃদ্ধ বাবা-মা এখনও ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন। মানবিক কারণে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ছোট ছেলের সীমিত আয়েই কোনো রকমে সংসার চলছে। একটি ছোট ঘরে বসবাস করছেন বৃদ্ধ দম্পতি। নিয়ামুল নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ ১১ বছর পার হলেও তারা কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসন সুবিধা পাননি বলে অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। আবেদন পেলে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উপকূলীয় অঞ্চলের অসংখ্য জেলে পরিবারের মতো নিয়ামুলের পরিবারও আজ অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার এক দীর্ঘ অধ্যায়ের মধ্যে বন্দি। সাগরে হারিয়ে যাওয়া একজন সন্তানের ফিরে আসার আশায় দিন গুনছেন বৃদ্ধ মা-বাবা। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও তাদের চোখের সেই প্রতীক্ষা আজও ফুরায়নি।