বিশেষ প্রতিবেদক।
এক সময় উত্তরাঞ্চলের শান্ত, কৃষিনির্ভর ও শিক্ষাবান্ধব জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল রংপুর। বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, নদী, হাট-বাজার আর গ্রামীণ জীবনযাত্রার জন্য জেলার আলাদা পরিচিতি ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। এখন জেলার বিভিন্ন উপজেলা, পৌর এলাকা এবং প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে উদ্বেগজনকভাবে বিস্তার লাভ করেছে মাদক ব্যবসা ও মাদকাসক্তি। প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে, নিয়মিত গ্রেপ্তার হচ্ছে মাদক কারবারি, উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন ও অন্যান্য মাদক। তারপরও কোনোভাবেই থামছে না মাদকের অবাধ সরবরাহ। স্থানীয়দের ভাষায়, “যে গতিতে অভিযান চলছে, তার চেয়েও দ্রুত গতিতে তৈরি হচ্ছে নতুন মাদক চক্র।” ফলে গ্রেপ্তারের পরও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবার একই এলাকায় মাদকের বেচাকেনা শুরু হয়ে যাচ্ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাদক এখন কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, পারিবারিক বন্ধন, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, বিভিন্ন মামলার তথ্য এবং বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ ও কাউনিয়া বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত মাদকপ্রবণ এলাকা হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে তারাগঞ্জ, পীরগাছা, রংপুর সদর ও গঙ্গাচড়া উপজেলাতেও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বেশি থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
জেলার মধ্যে বদরগঞ্জ উপজেলার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। উপজেলার একাধিক ইউনিয়ন ও বাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, লোহানীপাড়া, কুতুবপুর, গোপীনাথপুর, রামনাথপুর, রাধানগর, বিষ্ণুপুর, কালুপাড়া, গোপালপুর, মধুপুর ও দামোদরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সময়ে সময়েই মাদক বেচাকেনার অভিযোগ উঠে আসে। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা জানালেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী স্থায়ী পরিবর্তন এখনও দৃশ্যমান হয়নি। উপজেলার কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, একসময় যেসব বাজার কেবল কৃষিপণ্য ও স্থানীয় বাণিজ্যের জন্য পরিচিত ছিল, এখন সেখানে মাদক লেনদেনের অভিযোগও শোনা যায়। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীরাও অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট বাজারকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের একটি অংশ মাদক কেনাবেচার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের ভাষ্য, একাধিক সড়কের সংযোগস্থল হওয়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের যাতায়াত সহজ, যা অপরাধচক্রও কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। ব্যবসায়ীদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করলেও অপরাধচক্র ভেঙে দিতে আরও ধারাবাহিক ও গোয়েন্দাভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। রংপুরের বৃহৎ উপজেলা মিঠাপুকুরের বিভিন্ন ইউনিয়নেও মাদক বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়রা জানান, গ্রামীণ সড়ক, বাজার ও নির্জন এলাকায় গোপনে মাদক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে গাঁজা ও ইয়াবার প্রতি আসক্তি বাড়ছে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক কিশোর-তরুণ প্রথমে কৌতূহলবশত মাদক গ্রহণ শুরু করলেও পরে আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং পরিবারের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। পীরগঞ্জ ও কাউনিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নেও মাদক ব্যবসা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ রয়েছে। সীমান্তবর্তী যোগাযোগ, আন্তঃউপজেলা সড়ক এবং প্রত্যন্ত গ্রামীণ পথ ব্যবহার করে মাদক পরিবহনের অভিযোগ শোনা যায়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং মাদক সরবরাহ চক্র ভেঙে দিতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতে, মাদক ব্যবসায়ীদের অন্যতম লক্ষ্য এখন কিশোর ও তরুণরা। সহজলভ্যতা, কৌতূহল, খারাপ সঙ্গ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক জানান, নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।স্থানীয় শিক্ষকদের মতে, কিশোর ও তরুণদের লক্ষ্য করেই মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে বিনা মূল্যে বা কম দামে মাদক দিয়ে আসক্ত করার অভিযোগ বহুদিনের। শিক্ষকদের ভাষ্য, একবার আসক্ত হয়ে গেলে অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে দেয়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং পরে বিভিন্ন অপরাধেও জড়িয়ে যেতে পারে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও বিভিন্ন সময়ে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক উদ্ধার করছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি নিয়মিত অভিযান হয়, তাহলে এত বিপুল পরিমাণ মাদক কোথা থেকে আসছে? কারা এই সরবরাহ চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে? কেন একের পর এক গ্রেপ্তারের পরও একই এলাকায় নতুন করে ব্যবসা শুরু হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই রংপুরের বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে অনুসন্ধান চালিয়েছে আমাদের প্রতিনিধি দল। রংপুরের বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে মাদক এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও মাদক উদ্ধার হচ্ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছে কারবারি। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি অভিযান চলমান থাকে, তবে একই এলাকায় বারবার নতুন করে কীভাবে মাদক বিক্রি শুরু হয়?অনেকের মতে, কেবল খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরবরাহ চক্র, অর্থের উৎস এবং সংগঠিত নেটওয়ার্ক ভেঙে না দিলে মাদক ব্যবসা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।
মাদকাসক্তির সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে পরিবারে। বিভিন্ন এলাকায় কথা বলে জানা যায়, মাদকাসক্ত সদস্যকে ঘিরে সংসারে কলহ, আর্থিক সংকট, সহিংসতা এবং বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় চিকিৎসা, ঋণ এবং সংসার চালানো—সবকিছুই কঠিন হয়ে উঠেছে। স্ত্রী-সন্তান নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, আবার অনেক বাবা-মা সন্তানকে বাঁচাতে জমিজমা বিক্রি করেও চিকিৎসা করাচ্ছেন। বদরগঞ্জের গোপীনাথপুর ইউনিয়নের সমাজকর্মী লাভলু মিয়া বলেন, “আমরা চাই আমাদের সন্তান লেখাপড়া করুক। কিন্তু খারাপ সঙ্গ আর সহজে মাদক পাওয়া যাওয়ায় অনেক পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ছে।” রংপুরের বিভিন্ন হাট-বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাদক ব্যবসার কারণে বাজারের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ অপ্রয়োজনে বের হতে চান না। নাগেরহাট এলাকার ব্যবসায়ী পার্থ শাহা বলেন, “অপরাধীদের কারণে পুরো এলাকার সুনাম নষ্ট হয়। ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা চাই নিয়মিত নজরদারি থাকুক।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত জনবল ও যানবাহন নিয়ে পুরো জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। একজন কর্মকর্তা জানান, মাদক ব্যবসায়ীরা প্রায়ই কৌশল বদলায়। তারা ছোট ছোট চালানে মাদক বহন করে এবং মোবাইল যোগাযোগের মাধ্যমে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে, ফলে তাদের ধরতে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। জেলা পুলিশ ও রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্র জানায়, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান, ওয়ারেন্ট তামিল এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের দাবি, শুধু মাদক উদ্ধার নয়, সরবরাহ চক্র শনাক্ত করতেও কাজ চলছে।রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ-এর দিকনির্দেশনায় মে থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত পরিচালিত বিশেষ অভিযানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরপিএমপি সূত্র জানায়, তিন মাসে মোট ১ হাজার ৬২৬ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর মধ্যে— ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ৩১৬ জন। মাদক কারবারি ২৮২ জন। চোর ৫৩ জন। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি ৩২ জন। খুন মামলার আসামি৫ জন। নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য ১২ জন।অন্যান্য মামলার আসামি ৯২৬ জন।বিশেষ অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে— ইয়াবা ২,৬৮১ পিস। হেরোইন ৪৭.২ গ্রাম। গাঁজা ২০ কেজি ৪ গ্রাম। ফেনসিডিল/এস্কাফ ১৫৮ বোতল। চোলাই মদ ৩৩.৫ লিটার। ট্যাপেন্টাডল ৪৮টি। মরফিন ইনজেকশন ২৫টি। এছাড়া ১৬ মণ চোরাই তামার তার, একটি ট্রাক, পাঁচটি অটোরিকশা এবং আটটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
রংপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষের দাবি মাদকের মূল সরবরাহকারী ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কিশোর-তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম নিয়মিত করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, সমাজকর্মী ও প্রশাসনকে নিয়ে মাদকবিরোধী কমিটি সক্রিয় করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ আরও বাড়াতে হবে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার দিয়ে মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। তাদের মতে, একজন তরুণ যখন মাদকাসক্ত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবার; আর হাজারো তরুণ আসক্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।
রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অনুসন্ধানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, মাদকের বড় চালান কোথা থেকে আসে? সরবরাহ চক্র কীভাবে এত দ্রুত পুনর্গঠিত হয়? কেন একই এলাকায় বারবার মাদক উদ্ধার হচ্ছে? কীভাবে তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখা যাবে? পুনর্বাসন কার্যক্রম কি পর্যাপ্ত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই এখন প্রশাসন ও সমাজের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রংপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু জাফর বলেন, “রংপুর শহরে আমাদের একটি অফিস থেকে পুরো জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করতে হয়। জনবল ও যানবাহনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
শিশুদের পড়িয়ে, হাটে বড়ই বিক্রি করে এসএসসিতে এ প্লাস পেল দুর্জয়
Reporter Name 


















