Dhaka , Sunday, 13 September 2026
শিরোনাম :
কচুয়ায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে জয় ঢাকার টপ ছিনতাইকারী আলামীনকে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।। তিন শতাধিক বাস, হাজারো যাত্রী,বেহাল টার্মিনালে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি মহিলাদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বাগেরহাটে আলোচনা সভা বাগেরহাটে কিশোরীদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রশিক্ষণ, চেক ও চারা বিতরণ মাছ-সবজির স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা, এখন আলুর ভরসায় ধুঁকছে বাগেরহাটের প্রথম কোল্ড স্টোরেজ কাপড় পেঁচিয়ে ফুটবল খেলা, মাদ্রাসাছাত্রদের হাতে বল তুলে দিলেন এডিসি বাগেরহাটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা বাগেরহাটে IELTS ও জাপানি ভাষা শিক্ষা নিয়ে সেমিনার বাগেরহাট পৌরসভার সড়ক উন্নয়নে অনিয়মের অভিযোগ, পুরোনো ঠিকাদারের হাতেই একাধিক কাজ,

ঘর ভাড়া দিতে মাথার চুল ১ হাজার টাকায় বিক্রি রেহানার,রেললাইনের পাশে দুই সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : 07:19:37 pm, Saturday, 8 August 2026
  • 46 বার

বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ

দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিনই বেঁচে থাকার লড়াই করছেন রেহানা বেগম (৩০)। সংসারের অভাব আর স্বামীর নির্যাতনের মধ্যে সন্তানদের নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারিয়েছেন তিনি। ঘর ভাড়া পরিশোধের টাকা জোগাড় করতে শেষ পর্যন্ত নিজের মাথার চুল মাত্র এক হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। বর্তমানে চার বছরের ছেলে রোহান ও তিন বছরের মেয়ে আলোমতিকে নিয়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর এলাকায় বসবাস করছেন রেহানা। স্থানীয়দের সহযোগিতায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি হলেও টিনের ছাউনি দেওয়ার সামর্থ্য নেই তার। ফলে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়েই দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে তার। রেহানা বেগম তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। তার ছোট বোন মানসিক প্রতিবন্ধী। বৃদ্ধ বাবা অন্যের বাড়িতে কাজ করে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালান। নিত্যদিনের অভাবের কারণে অনেক সময় বাবার আয়ের ওপরও নির্ভর করতে হয় রেহানাকে।

রেহানার অভিযোগ, তার স্বামী জাফর আলী মাদকাসক্ত। মাদক কেনার টাকা না পেলে প্রায়ই তাকে মারধর করেন তিনি। কখনো ভিক্ষা করে কিংবা মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে পাওয়া টাকাও স্বামী নিয়ে যান বলে জানান রেহানা। সংসারে অভাব এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছিল যে কিছুদিন আগে দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় সেখান থেকেও চলে আসতে হয়। পরে মানুষের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে পাওয়া টাকা এবং নিজের মাথার চুল বিক্রি করে মোট ৩ হাজার ৫০০ টাকা জোগাড় করেন। এর মধ্যে নিজের চুল বিক্রি করে পান মাত্র ১ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়েই পরিশোধ করেন ঘরভাড়া। এরপর থেকে রেললাইনের পাশেই আশ্রয় নিয়েছেন রেহানা। স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হলেও টিন কেনার সামর্থ্য না থাকায় ছাউনি দিতে পারেননি। ফলে খোলা আকাশের নিচেই দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে তাকে। রেহানা বেগম বলেন, “দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট সহ্য করি। ঘর নেই, খাবারও নেই। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চেয়ে যা পাই, তা দিয়েই সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিই। স্বামী মাদক খেয়ে আমাকে মারধর করে। শেষ পর্যন্ত ঘরের ভাড়া দিতে নিজের চুলও বিক্রি করতে হয়েছে। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই—সন্তান দুটোকে নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে চাই।”

তিনি আরও বলেন, “যখন খুব ক্ষুধা লাগে, তখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ থাকে না। কখনো কখনো বাধ্য হয়ে খালের পানি পান করি। মানুষের কাছ থেকে খাবার চেয়ে এনে খাই। মানুষ আমার জন্য একটি ঘর বানিয়ে দিয়েছে, কিন্তু এখনো ছাউনি দিতে পারিনি। এভাবেই চলছে আমার জীবন।” সরেজমিনে দেখা যায়, সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেললাইনের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তৈরি একটি অসম্পূর্ণ ঘর। সেখানেই দুই সন্তানকে নিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন রেহানা। পাশেই অবস্থান করছেন তার ছোট বোন। ঘরের ওপর কোনো টিনের ছাউনি নেই। চারপাশেও নেই পর্যাপ্ত বেড়া। বৃষ্টি হলে সেখানে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, রেহানার মতো অসহায় একজন নারীকে দুই সন্তান নিয়ে এভাবে বসবাস করতে দেখা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তার জন্য একটি নিরাপদ ঘর, নিয়মিত খাদ্য সহায়তা এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা জরুরি।

 

এদিকে রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না ফেরদৌস জানিয়েছেন, অসহায় রেহানা বেগমের জন্য এক মাসের প্রয়োজনীয় শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি তার বসবাসের জন্য একটি ঘরেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।উপজেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে রেহানা ও তার দুই সন্তানের জীবনে। তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, রেহানার মতো অসহায় পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, নিরাপদ আবাসন ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

khan

জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে জয়

ঘর ভাড়া দিতে মাথার চুল ১ হাজার টাকায় বিক্রি রেহানার,রেললাইনের পাশে দুই সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন

আপডেট টাইম : 07:19:37 pm, Saturday, 8 August 2026

বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ

দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিনই বেঁচে থাকার লড়াই করছেন রেহানা বেগম (৩০)। সংসারের অভাব আর স্বামীর নির্যাতনের মধ্যে সন্তানদের নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারিয়েছেন তিনি। ঘর ভাড়া পরিশোধের টাকা জোগাড় করতে শেষ পর্যন্ত নিজের মাথার চুল মাত্র এক হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। বর্তমানে চার বছরের ছেলে রোহান ও তিন বছরের মেয়ে আলোমতিকে নিয়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর এলাকায় বসবাস করছেন রেহানা। স্থানীয়দের সহযোগিতায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি হলেও টিনের ছাউনি দেওয়ার সামর্থ্য নেই তার। ফলে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়েই দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে তার। রেহানা বেগম তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। তার ছোট বোন মানসিক প্রতিবন্ধী। বৃদ্ধ বাবা অন্যের বাড়িতে কাজ করে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালান। নিত্যদিনের অভাবের কারণে অনেক সময় বাবার আয়ের ওপরও নির্ভর করতে হয় রেহানাকে।

রেহানার অভিযোগ, তার স্বামী জাফর আলী মাদকাসক্ত। মাদক কেনার টাকা না পেলে প্রায়ই তাকে মারধর করেন তিনি। কখনো ভিক্ষা করে কিংবা মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে পাওয়া টাকাও স্বামী নিয়ে যান বলে জানান রেহানা। সংসারে অভাব এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছিল যে কিছুদিন আগে দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় সেখান থেকেও চলে আসতে হয়। পরে মানুষের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে পাওয়া টাকা এবং নিজের মাথার চুল বিক্রি করে মোট ৩ হাজার ৫০০ টাকা জোগাড় করেন। এর মধ্যে নিজের চুল বিক্রি করে পান মাত্র ১ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়েই পরিশোধ করেন ঘরভাড়া। এরপর থেকে রেললাইনের পাশেই আশ্রয় নিয়েছেন রেহানা। স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হলেও টিন কেনার সামর্থ্য না থাকায় ছাউনি দিতে পারেননি। ফলে খোলা আকাশের নিচেই দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে তাকে। রেহানা বেগম বলেন, “দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট সহ্য করি। ঘর নেই, খাবারও নেই। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চেয়ে যা পাই, তা দিয়েই সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিই। স্বামী মাদক খেয়ে আমাকে মারধর করে। শেষ পর্যন্ত ঘরের ভাড়া দিতে নিজের চুলও বিক্রি করতে হয়েছে। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই—সন্তান দুটোকে নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে চাই।”

তিনি আরও বলেন, “যখন খুব ক্ষুধা লাগে, তখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ থাকে না। কখনো কখনো বাধ্য হয়ে খালের পানি পান করি। মানুষের কাছ থেকে খাবার চেয়ে এনে খাই। মানুষ আমার জন্য একটি ঘর বানিয়ে দিয়েছে, কিন্তু এখনো ছাউনি দিতে পারিনি। এভাবেই চলছে আমার জীবন।” সরেজমিনে দেখা যায়, সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেললাইনের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তৈরি একটি অসম্পূর্ণ ঘর। সেখানেই দুই সন্তানকে নিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন রেহানা। পাশেই অবস্থান করছেন তার ছোট বোন। ঘরের ওপর কোনো টিনের ছাউনি নেই। চারপাশেও নেই পর্যাপ্ত বেড়া। বৃষ্টি হলে সেখানে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, রেহানার মতো অসহায় একজন নারীকে দুই সন্তান নিয়ে এভাবে বসবাস করতে দেখা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তার জন্য একটি নিরাপদ ঘর, নিয়মিত খাদ্য সহায়তা এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা জরুরি।

 

এদিকে রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না ফেরদৌস জানিয়েছেন, অসহায় রেহানা বেগমের জন্য এক মাসের প্রয়োজনীয় শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি তার বসবাসের জন্য একটি ঘরেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।উপজেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে রেহানা ও তার দুই সন্তানের জীবনে। তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, রেহানার মতো অসহায় পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, নিরাপদ আবাসন ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।